ঋণ মূল্যায়নের বিভিন্ন দিকসমূহ কী কী? ঋণ মূল্যায়ন এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
কোনো ঋণ প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য কি না, সেটা যাচাই করতে গিয়ে ব্যাংক সাধারণত সাতটি দিক থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখে। এই পুরো প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ঋণ মূল্যায়ন। নিচে সাতটি দিকের বিস্তারিত আলোচনা করা হলোঃ
১. ব্যবস্থাপনাগত দিক (Managerial Aspect)
প্রকল্প যারা চালাবেন, তাদের দক্ষতা আর অভিজ্ঞতা এখানে বিচার করা হয়। কারণ প্রকল্প যতই ভালো হোক, ব্যবস্থাপনা দুর্বল হলে সেটা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। তাই উদ্যোক্তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, আগের ঋণ পরিশোধের রেকর্ড এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা কেমন — এসব কিছুই এখানে দেখা হয়।
২. সাংগঠনিক দিক (Organizational Aspect)
প্রতিষ্ঠানটি একক মালিকানাধীন, নাকি অংশীদারি, নাকি প্রাইভেট বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি — সেটা এখানে যাচাই হয়। প্রতিটি কাঠামোর আইনগত দায়বদ্ধতা আলাদা, পরিচালন পদ্ধতিও ভিন্ন, তাই এই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
৩. কারিগরি দিক (Technical Aspect)
প্রকল্পটি টেকনিক্যালি বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা এখানে পরীক্ষা করা হয়। প্রকল্পের অবস্থান কেমন, কাঁচামাল সহজে পাওয়া যাবে কি না, পরিবহন-বিদ্যুৎ-পানির ব্যবস্থা ঠিক আছে কি না, উৎপাদন ক্ষমতা ও প্রযুক্তি উপযুক্ত কি না, এমনকি কারখানার নকশা ও বিন্যাস পর্যন্ত খতিয়ে দেখা হয়।
৪. বাজারজাতকরণ দিক (Marketing Aspect)
পণ্যের চাহিদা কেমন, সরবরাহ কতটা, প্রতিযোগিতা কী পরিমাণ, দাম কী রকম হবে এবং কীভাবে পণ্যটি বাজারে পৌঁছাবে — এই সবকিছু এই অংশে বিশ্লেষণ করা হয়। বাজারের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অবস্থা, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব শক্তি ও দুর্বলতা, সবই এখানে বিবেচনায় আসে।
৫. আর্থিক দিক (Financial Aspect)
মূল্যায়নের সবচেয়ে ভারী অংশ এটাই। আয়-ব্যয়ের হিসাব, ব্যালেন্স শিট, নগদ প্রবাহ, আর্থিক পূর্বাভাস, ব্রেক-ইভেন বিশ্লেষণ, প্রকল্প ব্যয় ও অর্থায়নের উৎস — সবকিছু খতিয়ে দেখা হয়। এর পাশাপাশি NPV, IRR, BCR, Payback Period-এর মতো বিনিয়োগ মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং সংবেদনশীলতা বিশ্লেষণও এখানে প্রয়োগ করা হয়।
৬. সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক (Socio-Economic Aspect)
প্রকল্পটি দেশের অর্থনীতি ও সমাজে কেমন প্রভাব ফেলবে, তা এখানে বিবেচনা করা হয়। নতুন কর্মসংস্থান হবে কি না, আয় বাড়বে কি না, ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ হবে কি না, অবকাঠামো ও জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে কি না — এসবই এই মূল্যায়নের অংশ।
৭. পরিবেশগত দিক (Environmental Aspect)
প্রকল্পের ফলে পরিবেশে কী প্রভাব পড়বে, তা এখানে যাচাই করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সীমার ওপরে ঋণ প্রস্তাবের ক্ষেত্রে Environmental Risk Rating (EnvRR) করতেই হয়। পরিবেশ-সংবেদনশীল শিল্পের ক্ষেত্রে Environmental Due Diligence (EDD)-ও সম্পন্ন করা হয়, আর প্রয়োজনে অতিরিক্ত শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়।
ঋণ মূল্যায়নের গুরুত্ব
ব্যাংকের দৃষ্টিকোণ থেকে
ঋণ মূল্যায়নের ফলে ব্যাংক বুঝতে পারে কাকে ঋণ দেওয়া নিরাপদ, ফলে ঋণঝুঁকি একটি সহনীয় মাত্রায় রাখা সম্ভব হয়। প্রকল্পের বাণিজ্যিক, কারিগরি ও সামাজিক-অর্থনৈতিক দিকগুলো বাস্তবসম্মত কি না, তা এখানেই যাচাই হয়ে যায়। পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং সংক্রান্ত বিধি-বিধান ও আইনগত শর্তাবলি ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না, সেটাও নিশ্চিত হওয়া যায়।
ঋণগ্রহীতার দৃষ্টিকোণ থেকে
ঋণ মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে ঋণগ্রহীতা নিজেই বুঝতে পারেন তার প্রকল্প বাস্তবে কতটা কার্যকর। পরিকল্পনায় কোথাও ফাঁক বা দুর্বলতা থাকলে তা ধরা পড়ে, আর সেটা শোধরানোর পথও বাতলে দেওয়া হয়।
জাতীয় অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে
দেশের সম্পদ সীমিত। ঋণ মূল্যায়নের মাধ্যমে এই সীমিত সম্পদ সঠিক জায়গায় বিনিয়োজিত হয়। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়, শিল্পায়নের গতি বাড়ে, রপ্তানি বৃদ্ধি পায় — আর সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এক ধাপ এগিয়ে যায়।
Credit Operations and Management, Module: C, 6th BPE 2(b), 98th BPE 3(c), 99th BPE 4(a)
