বর্তমানে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কী ধরনের ঋণ সুবিধা প্রদান করে?
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাধারণত দুই ধরনের ঋণ সুবিধা প্রদান করে:
১. ফান্ডেড ঋণ সুবিধা (Funded Credit Facilities)
২. নন-ফান্ডেড ঋণ সুবিধা (Non-Funded Credit Facilities)
ফান্ডেড ঋণ সুবিধা (Funded Credit Facilities)
ফান্ডেড ঋণ হলো এমন ঋণ সুবিধা, যেখানে ব্যাংক সরাসরি গ্রাহকের কাছে অর্থ বিতরণ করে। ঋণগ্রহীতা সেই অর্থ ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করে এবং নির্ধারিত শর্ত ও সময়সূচি অনুযায়ী ব্যাংককে পরিশোধ করে।
মেয়াদি ঋণ (Term Loan / Time Loan)
মেয়াদি ঋণ হলো নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ, যা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যাংক গ্রাহককে প্রদান করে। ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কিস্তিতে অথবা এককালীন অর্থ পরিশোধ করে। মেয়াদি ঋণ ৩ ধরনের হয়ঃ
- স্বল্পমেয়াদি ঋণ (১ বছর পর্যন্ত) কার্যকরী মূলধনের চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়।
- মধ্যমেয়াদি ঋণ (২-৫ বছর) ব্যবসায় সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হয়।
- দীর্ঘমেয়াদি ঋণ (৫ বছরের বেশি) যন্ত্রপাতি ক্রয়, ভবন নির্মাণ এবং BMRE কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়।
ক্যাশ ক্রেডিট (Cash Credit)
ক্যাশ ক্রেডিট হলো কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজনে প্রদত্ত একটি ঘূর্ণায়মান (Revolving) ঋণসীমা।
- CC Pledge: ব্যাংক পণ্যের প্রকৃত দখল নিজের কাছে রাখে।
- CC Hypothecation: পণ্য গ্রাহকের কাছে থাকে, তবে ব্যাংকের আইনগত অধিকার বজায় থাকে।
- এটি ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও উৎপাদনকারীদের মধ্যে জনপ্রিয়।
ওভারড্রাফট (Overdraft – OD)
ওভারড্রাফট এমন একটি সুবিধা, যার মাধ্যমে চলতি হিসাবধারী (Current Account Holder) তার হিসাবের জমাকৃত অর্থের চেয়ে বেশি অর্থ উত্তোলন করতে পারে।
- শুধুমাত্র ব্যবহৃত অর্থের ওপর সুদ ধার্য করা হয়।
- অনুমোদিত সীমার মধ্যে বারবার টাকা উত্তোলন ও পরিশোধ করা যায়।
- সাধারণত প্রতিবছর এই সুবিধা নবায়ন করা হয়।
বিল ক্রয় ও বিল ডিসকাউন্টিং (Bill Purchase and Discount)
এটি এমন একটি সুবিধা, যেখানে ব্যাংক মেয়াদপূর্তির আগেই রপ্তানি বিল ডিসকাউন্ট করে ক্রয় করে।
- বিল নিজেই প্রধান জামানত হিসেবে কাজ করে।
- ব্যাংক আগাম সুদ কেটে নিয়ে অবশিষ্ট অর্থ প্রদান করে।
- এতে রপ্তানিকারক দ্রুত অর্থ পেয়ে থাকে।
ট্রাস্ট রিসিপ্ট (Trust Receipt – TR)
ট্রাস্ট রিসিপ্ট হলো আমদানির পর প্রদত্ত একটি অর্থায়ন সুবিধা, যেখানে ব্যাংক পূর্ণ অর্থ পরিশোধের আগেই আমদানিকৃত পণ্য গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর করে।
- গ্রাহক পণ্য বিক্রির অর্থ থেকে ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়।
- সাধারণত ৩০ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে হয়।
- সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত পণ্যের মালিকানা ব্যাংকের অধীনে থাকে।
প্যাকিং ক্রেডিট (Packing Credit – PC)
এটি রপ্তানিকারকদের জন্য প্রদত্ত প্রি-শিপমেন্ট ঋণ।
- পণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিংয়ের জন্য এ ঋণ দেওয়া হয়।
- একটি নিশ্চিত রপ্তানি এলসি (Export LC) বা রপ্তানি চুক্তি থাকতে হয়।
- সর্বোচ্চ ১৮০ দিনের জন্য এ ঋণ দেওয়া হয়।
এলসি বিল ঋণ (Bills under LC – BLC/PAD)
এটি এলসির আওতায় গৃহীত আমদানি দলিলের বিপরীতে প্রদত্ত স্বল্পমেয়াদি ঋণ।
- এটিকে PAD (Payment Against Documents) ও বলা হয়।
- আমদানি দলিলের মূল্য পরিশোধ ও গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের মধ্যবর্তী সময়ের অর্থায়ন করে।
- সাধারণত সর্বোচ্চ ২১ দিনের জন্য এ সুবিধা দেওয়া হয়।
ভোক্তা ঋণ (Consumer Credit)
ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানোর জন্য কিস্তিভিত্তিক (EMI) যে ঋণ প্রদান করা হয়, তাকে ভোক্তা ঋণ বলে।
- গৃহঋণ (Home Loan): বাড়ি ক্রয় বা নির্মাণে ব্যবহৃত হয়।
- গাড়ি ঋণ (Auto Loan): নতুন বা পুনঃসংস্কারকৃত যানবাহন ক্রয়ে ব্যবহৃত হয়।
- ব্যক্তিগত ঋণ (Personal Loan): চিকিৎসা, শিক্ষা, ভ্রমণ বা সংস্কার কাজে ব্যবহৃত হয়।
সিএমএসএমই ঋণ (CMSME Credit)
কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রদত্ত ঋণকে CMSME ঋণ বলে।
- এটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী মোট ঋণের কমপক্ষে ২৫% CMSME খাতে বিতরণ করতে হয়।
- ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্ত ও জামানতবিহীন সুবিধা রয়েছে।
সিন্ডিকেটেড ঋণ (Syndicated Loan)
একাধিক ব্যাংক যৌথভাবে কোনো বড় প্রকল্প বা প্রতিষ্ঠানের জন্য যে ঋণ প্রদান করে, তাকে সিন্ডিকেটেড ঋণ বলে।
- কোনো একক ব্যাংক পুরো অর্থ প্রদান করে না।
- অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঝুঁকি ভাগ হয়ে যায়।
- একটি লিড ব্যাংক পুরো কার্যক্রম সমন্বয় করে।
লিজ অর্থায়ন (Lease Financing)
এটি এমন একটি অর্থায়ন ব্যবস্থা, যেখানে ব্যাংক কোনো সম্পদ কিনে গ্রাহকের কাছে ভাড়াভিত্তিক ব্যবহারের সুযোগ দেয়।
- গ্রাহক নির্দিষ্ট সময় অন্তর লিজ ভাড়া পরিশোধ করে।
- লিজ মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সম্পদের মালিকানা ব্যাংকের থাকে।
- বড় অঙ্কের প্রাথমিক বিনিয়োগ ছাড়াই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারে।
নন-ফান্ডেড ঋণ সুবিধা (Non-Funded Credit Facilities)
নন-ফান্ডেড ঋণ হলো এমন সুবিধা, যেখানে ব্যাংক সরাসরি অর্থ প্রদান করে না; বরং গ্রাহকের পক্ষে লিখিত প্রতিশ্রুতি বা গ্যারান্টি প্রদান করে। গ্রাহক ব্যর্থ হলে তখন ব্যাংক অর্থ পরিশোধ করে এবং সুবিধাটি ফান্ডেড ঋণে পরিণত হয়। তাই এগুলোকে Contingent Liability (শর্তসাপেক্ষ দায়) বলা হয়।
লেটার অব ক্রেডিট (Letter of Credit – L/C)
এলসি হলো আমদানিকারকের পক্ষে ব্যাংকের প্রদত্ত লিখিত অঙ্গীকার, যেখানে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বিদেশি বিক্রেতাকে অর্থ প্রদানের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়।
- আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
- ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের ঝুঁকি কমে যায়।
- সঠিক দলিল উপস্থাপনের পর ব্যাংক অর্থ প্রদান করে।
বিড বন্ড (Bid Bond)
টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ব্যাংক যে গ্যারান্টি প্রদান করে, তাকে বিড বন্ড বলে।
- এটি টেন্ডার কর্তৃপক্ষকে গ্রাহকের সক্ষমতা সম্পর্কে আশ্বস্ত করে।
- ব্যাংক সাধারণত নগদ মার্জিন ও কাউন্টার গ্যারান্টি গ্রহণ করে।
- গ্রাহক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে ব্যাংক ক্ষতিপূরণ প্রদান করে।
পারফরম্যান্স বন্ড (Performance Bond)
চুক্তি অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করার নিশ্চয়তা হিসেবে ব্যাংক যে গ্যারান্টি দেয়, তাকে পারফরম্যান্স বন্ড বলে।
- গ্রাহক ব্যর্থ হলে ব্যাংক ক্ষতিপূরণ প্রদান করে।
- নির্মাণ, অবকাঠামো ও সরবরাহ খাতে এটি বেশি ব্যবহৃত হয়।
- ব্যাংক প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও মার্জিন গ্রহণ করে।
ডিফার্ড পেমেন্ট গ্যারান্টি (Deferred Payment Guarantee)
কিস্তিতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে প্রদত্ত গ্যারান্টিকে ডিফার্ড পেমেন্ট গ্যারান্টি বলে।
- আমদানিকারক ধাপে ধাপে মূল্য পরিশোধ করতে পারে।
- বিদেশি সরবরাহকারী ব্যাংকের গ্যারান্টির মাধ্যমে অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা পায়।
- ভারী শিল্প যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানিতে এটি বেশি ব্যবহৃত হয়।
কাস্টমস ও এক্সাইজ গ্যারান্টি (Customs and Excise Guarantee)
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অনুকূলে ভবিষ্যতে শুল্ক পরিশোধের নিশ্চয়তা হিসেবে ব্যাংক যে গ্যারান্টি প্রদান করে, তাকে কাস্টমস ও এক্সাইজ গ্যারান্টি বলে।
- পূর্ণ শুল্ক পরিশোধের আগেই পণ্য খালাস করা যায়।
- নির্ধারিত সময়ে শুল্ক পরিশোধের নিশ্চয়তা দেয়।
- গ্রাহক ব্যর্থ হলে ব্যাংক সরাসরি বকেয়া শুল্ক পরিশোধ করে।
